খুলনায় বাণিজ্যিকভাবে ত্বীন চাষ

19

খুলনা প্রতিনিধি:
আটি ও বিচিহীন, বিচিত্র কালারের দৃষ্টি নন্দন ফল। দেখতে অতি আকর্ষণীয়, কোমল ও সরস, সু-মিষ্ট রসালো স্বাদ যুক্ত। ফলটি আবরণ (ছোগলা) সহকারেই খাওয়া যায়। পুষ্টিগুণে সৃমদ্ধ এই ফলটি হচ্ছে ত্বীন। পবিত্র কোরআন মাজিদের ত্বীন সুরায় বর্ণিত মিষ্টি, রসে ভরপুর ও সুস্বাদু এই ফল বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।

ত্বীন ফল বছরের ৩৬৫ দিনই উচ্চ ফলন দিয়ে থাকে। রোগবালাই নেই বললেই চলে। ৬ মাসের ত্বীন চারা লাগানোর ২-৩ মাসের মধ্যেই ফল দেওয়া শুরু করে। একটি ত্বীন গাছ অন্তত ২৫ বছর পর্যন্ত গুনগত ফল দিয়ে থাকে। এমনটাই জানিয়েছেন কৃষক ও কৃষি বিভাগ।

খুলনায় প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে ত্বীন চাষ শুরু করেছে। ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষক নিউটন মন্ডল তার বাড়ির ছাদে ড্রাম পদ্ধতিতে একশ’টি গাছ লাগিয়েছে। শুধু ছাদেই নয়, মাঠেও লাগিয়েছে এই ফলের গাছ। সখের বসে একটি গাছ কিনে আজ তার ২০০টির মতো গাছ রয়েছে। যার প্রত্যেকটিতে ফল ধরেছে। মিসরীয় জাতের এই ফলটির গাছ থেকে কলম করে চারা তৈরি করছে এই নিউটন। পৃষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই ফলটি ভোজন রসিক মানুষের জন্য জনপ্রিয় হবে। এই ফলচাষে সফলতার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। একইসঙ্গে এর চারা দেশের আনাচে-কানাচে পৌছে দিতে চান তিনি। সে জন্য গাছ কাটিং করে প্রস্তুত করছেন কলমের চারা। সেই চারা চাষিদের মধ্যে বিক্রি করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সহজেই চাষযোগ্য এই গাছের সু-স্বাদু ফলের দামও ভালো। তাইতো শুধু নিউটনই নয়, কৃষক নবদ্বীপসহ খুলনার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ত্বীন ফল চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

ডুমুরিয়া উপজেলার ঘোনা মাদারডাঙ্গা এলাকার কৃষক নিউটন মন্ডল বলেন, সখের বসে গতবছর একটি ত্বীন ফল গাছ কিনে নিয়ে আসি। সেই গাছ থেকে ৫ কেজির মতো ফল পেয়েছি। ফলটি আমি খেয়েছি। খুব সুন্দর ও মিষ্টি। গাছটি থেকে ৫ কেজির মতো ফল পেয়েছি। এককেজি এক হাজার টাকায় বিক্রিও করেছি। যেহেতু ফলটি খেতে সুস্বাদু ও কোরআনে বর্ণিত ফলটিতে শুনেছি ৭০ প্রকার ঔষধি গুণ রয়েছে। তার পর চিন্তা করলাম একটু গা লাগিয়ে চাষ করে দেখি। এরপর কেরালা থেকে আরও ২০০টি গাছ আনিয়েছি। ছাদে প্রতি ড্রামে একটি গাছ লাগিয়ে পরিচর্যা করে ব্যয় পড়েছে এক হাজার ৬শ’ টাকা। নিজ বাড়ির ছাদে ড্রামে একশ’টি গাছ লাগিয়েছি।

এছাড়া দেড়শ’ আছে মাটিতে। যার প্রত্যেকটিতে ফল এসেছে। প্রতিটি গাছ থেকে অন্তত ৫ কেজি করে ফল আশা করছি। ২ মাস পর থেকে বাজারে ফল বিক্রি করতে পারবো। এই গাছটির একটা গুণ আছে একবার লাগালে সারাবছর ফল দেয়। যদি গাছটা যত্ন করা হয় তাহলে অন্তত এর আয়ুস্কাল রয়েছে ২০-২৫ বছর।

তিনি বলেন, এই ফলের পাইকারি বাজার মূল্য রয়েছে ৮শ’ থেকে এক হাজার টাকা। ২০০ গাছ থেকে এবার এক হাজার কেজি ফল উৎপাদনের আশা করছি। এছাড়া এই গাছ থেকে কলম করছি।

ত্বীন ফল নিয়ে নিজের স্বপ্ন তুলে ধরে নিউটন বলেন, চারা তৈরি করে সারাদেশে ত্বীন ছড়িয়ে দিতে চাই। জান্নাতি একটি ফল যা খেয়ে মানুষের দেহের ৭০ প্রকার ঔষধি গুণ রয়েছে সেটি গোটা বাংলাদেশে আমি ছড়াবো।

কৃষি ক্ষেত্রে অবদান রাখা এই কৃষক বলেন, আমার দেখা দেখি অনেকেই ত্বীন চাষে আগ্রহী হয়েছেন। এখানকার নবদীপসহ অনেকেই ত্বীন চাষে ঝুঁকছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ছাদে ত্বীন চাষে সফল হওয়া সম্ভব। যাদের ছাদ রয়েছে তারা অযথা ফেলে না রেখে ড্রাম পদ্ধতিতে ত্বীন, আপেল, রামভূটান, জয়তুন গাছ লাগায় তাহলে খুবই লাভবান হবে।

ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষক নবদ্বীপ বলেন, কোরআনে বর্ণিত স্বাদেগুণে ভরা ফলটি চাষে ভবিষ্যৎ খুব ভালো হবে। এই গাছের চারা ও ফল অনলাইন অথবা অফ লাইনে বিক্রি করবো।

ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোছাদ্দেক হোসেন বলেন, কোরআনে ত্বীন ফলকে শপথ করে কথা বলা হয়েছে। এটি একটি পবিত্র ফল। এটি একটি মিসরিয়া ফল। দেশে ত্বীন আগে লাগানো হতো না। গাছটি লাগানোর ২ থেকে তিন মাসে ফল চলে আসে। সহজেই চাষ করা যায়। আমাদের দেশের আবহাওয়া, জলবায়ু এবং মাটি ত্বীন চাষে অত্যন্ত উপযোগি। এটি মাঠেও লাগিয়ে দেখেছি, পাশাপাশি ছাদে ড্রামে লাগানো হয়েছে। এর ফলাফল অসাধারণ। অন্যান্য গাছে যেমন আমে স্প্রে না করলে রোগ বা পোকা হয়। কিন্তু এই গাছে কোন রোগ বা পোকা নেই। এটি খেতে খুবই সুস্বাদু এবং বড় কথা এর পুরো অংশ খাওয়া যায়।

তিনি বলেন, ফলটি সাধারণত সুপার মার্কেটগুলোতে পাওয়া যায়। এক কেজি ফলের দাম প্রায় ১২শ’ থেকে ১৪শ’ টাকা। গাছটি কাটিং করে চারা প্রস্তুত করা সহজ। বেলে ও দো-আঁশ মাটিতে এই গাছটি ভালো হয়। আর ছাদে লাগালে একদিকে যেমন পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে। পাশাপাশি এটি প্রকৃতিকে ভালো রাখবে, পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক থাকবে। সৌখিন কৃষকেরা ত্বীন ছাদে লাগাতে পারে। তেমন কোন পরিচর্যা নেই। শুধু ড্রামে ৫ কেজি কোকোফিড, ৫ কেজি ভার্মিকম্পোস্ট এবং এক কেজি কোকোডাস্ট দিয়ে মাটি তৈরি করে গাছ লাগাতে হবে।

এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ত্বীন বিক্ষিপ্তভাবে কয়কটি বাড়িতে চাষ হচ্ছে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে নিউটনের এখানেই প্রথম। এটি দেশের একটি সম্ভাবনাময় ফসল। নতুন এই ফসল সম্প্রসারণের চেষ্টা করছি।

খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ত্বীন একটি ডুমুর জাতীয় ফল। এটি পবিত্র কোরআনে বর্ণিত রয়েছে এবং খুবই পুষ্টিকর এবং সুমিষ্ট একটি ফল। খুলনায় প্রথমে বটিয়াঘাটার একটি মাদ্রাসায় এই ত্বীনের চারা এনে লাগানো হয়। সেখানে ভালো ফলন পাওয়াতে খুলনার বিভিন্ন উপজেলায় এটার বিস্তার লাভ করা শুরু করেছে। ত্বীনের চারা এখানে অপ্রতুল। যদি নার্সারির মাধ্যমে এই চারা আরও মাল্টিপ্লাই করতে পারি তাহলে সবার ভিতরে একটি জনপ্রিয়তা দেখা দিবে। বাংলার আনাচে-কানাচে এটি ছড়িয়ে পড়বে। এটি লবণসহনশীল একটি গাছ। তাই লবণাক্ত এলাকায় এটির সম্ভাবনা খুব বেশি আছে।

তিনি বলেন, নিউটন মন্ডল একটি নার্সারী করার চেষ্টা করছে। সেই নার্সারিতে ত্বীনের চারা তৈরি করে বিক্রির ব্যবস্থা করছে।