ট্রেনে ঘটছে ছিনতাই, থামছে না ঢিল ছোঁড়ার ঘটনা

1

ন্যাশনাল ডেস্ক: ছিনতাইকারী হাত থেকে নিজের কাছে থাকা ব্যাগটি রক্ষা করতে গিয়ে গত (২৪ ফেব্রুয়ারি) চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে বর্তমানে শয্যাশায়ী রয়েছে গার্মেন্টস কর্মী সাবিনা ইয়াসমিন। ‘মাথায় আঘাত পাওয়ায় ঘটনার পর থেকেই কাউকে চিনতে পারছেন না। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা, নড়াচড়া করলেই বমি করছেন। তরলজাতীয় খাবার ছাড়া আর কিছুই খেতে পারছেন না। অভাবের সংসারে এ যেন এক মরার উপর খাড়ার ঘা’—সাংবাদিকদের কাছে এভাবেই বর্তমান পরিস্থিতির কথা বলছিলেন সাবিনা ইয়াসমিনের বোন তাসলিমা আক্তার।চিকিৎসকরা তাদের জানিয়েছেন, সিটি স্ক্যান করানো হয়েছে। মাথায় রক্তক্ষরণ হয়েছে। তবে কোনও অপারেশনের প্রয়োজন হবে না। সাবিনা ইয়াসমিনের সুস্থ হতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। সে কারণেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর শনিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) আর্থিক সংকটের কারণে তাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার দুর্গাপুরে চলে যায় পরিবারের সদস্যরা।ছয় বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ায় অভাবের কারণে টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় ডিএএল মেটাল গার্মেন্টসে পাঁচ বছরের আগে কাজ নেন সাবিনা ইয়াসমিন। দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে মোটামুটি চলছিল অভাবের সংসার।এখন সংসার কিভাবে চলবে, চিকিৎসার টাকা কোথা থেকে আসবে, সন্তানের খরচ কিভাবে মিটবে এমন সব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে পরিবারের সদস্যদের মনে। এই ঘটনাটি গণমাধ্যমের মাধ্যমে সারাদেশের মানুষ জেনেছে। সাবিনা ইয়াসমিনের এক সহকর্মীর মাধ্যমে গার্মেন্টসে কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হলেও আর্থিক সহায়তা তো দূরের কথা ফোন করে খোঁজ-খবরও নেয়নি কেউ। ট্রেনে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সাবিনা ইয়াসমিনের মতো হতভাগ্যের তালিকা বাড়ছেই।প্রতিদিন ৩৬৬টি ট্রেন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছুটে চলে। যেখানে দুই লাখেরও বেশি যাত্রী রেল ভ্রমণ করেন। চলন্ত ট্রেনে ছিনতাইয়ের ঘটনা, ট্রেনে ঢিল ছোঁড়ার মতো ঘটনা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্য বলছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রেনে পাথর ছোড়ার মতো ঘটনা ঘটেছে প্রায় চল্লিশটির বেশি। এতে আহত হয়েছে শতাধিক।‘দেশের বিভিন্ন জায়গায় ট্রেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মগুলোতে নেই কোনও সীমানা প্রাচীর, যে কেউ যেকোনও সময় চলন্ত ট্রেনে উঠে পড়ছে কিংবা নেমে পড়ছে। তাদের ধরতে অনেকটাই বেগ পেতে হচ্ছে’ জানিয়ে ভৈরব রেলওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদাউস আহমেদ বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্ল্যাটফর্মগুলোর চারপাশ সুরক্ষিত হলে, অপরাধ করে কেউ পালিয়ে যেতে পারবে না। প্লাটফর্মে ঢোকা এবং বের হওয়ার জন্য একই রাস্তা থাকলে অপরাধ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তার পাশাপাশি ট্রেনের বিভিন্ন বগিতে নিয়োজিত রয়েছে রেলওয়ে পুলিশের সদস্যরা।তিনি বলেন, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর থেকে ১০ জনকে আটক করা হয়েছে। ট্রেনের ভিতর যাত্রীদের টার্গেট করে যেন ছিনতাই কিংবা অপরাধমূলক কাজ কেউ না ঘটাতে পারে সে ব্যাপারে ব্যাপক নজরদারি চলছে বলে জানান রেলওয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা।যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) জি এম কামরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ট্রেনে চলাচলের সময় প্রতিনিয়ত ঘটছে ছিনতাই কিংবা ঢিল ছোঁড়ার মতো ঘটনা। নিরাপত্তা এমন একটি জিনিস, কোনও জায়গায় হাতে হাত ধরে দাঁড় করিয়ে রাখলে নিরাপত্তা হবে না, নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দায়িত্বরত কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে আরও সতর্ক হলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব। নিরাপত্তার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে। তিনি বলেন, যেসব এলাকায় ট্রেনে ঢিল ছোঁড়ার মতো ঘটনা ঘটছে, এসব এলাকা চিহ্নিত করে আশপাশের স্কুল কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মেম্বার-চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। এছাড়া ছিনতাই প্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। যদিও রেলওয়ের নিরাপত্তায় কাজ করছে একাধিক বাহিনী। যাত্রীদের নিরাপত্তায় তাদের আরও পেট্রোলিং বাড়াতে হবে।রেলওয়ে পুলিশ ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার সাইফুল্লাহ আল মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ট্রেনে কোনও ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে জনগণকে সচেতন হতে হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তায় রেলওয়ে পুলিশ কাজ করছে। আগে থেকে ছিনতাই কিংবা পাথর ছোঁড়ার ঘটনা অনেকাংশেই কমেছে। যেসব জায়গায় পাথর ছোঁড়ার মতো ঘটনা ঘটছে সেসব এলাকার চিহ্নিত করে স্থানীয় শিক্ষক-শিক্ষার্থী মসজিদ মাদ্রাসা এবং স্থানীয় চেয়ারম্যান মেয়র কিংবা জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।তিনি বলেন, আগের চেয়ে ট্রেনে অপরাধের ঘটনা অনেক কমেছে। রেলওয়ে পুলিশের যে পরিমাণ জনবল রয়েছে, তা দিয়েই আন্তরিকতার সাথে যাত্রী নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে।